বাংলাদেশ | রবিবার, এপ্রিল ২২, ২০১৮ | ৯ বৈশাখ,১৪২৫

জাতীয়

03-01-2018 04:07:39 PM

সিলেটে ছাত্রদল যেন ‘বাবাদল’

newsImg

— এইটা তো আর ছাত্রদল রইল না, বাবাদল হয়ে আছে।

—  কীভাবে?

—  জেলা সভাপতি থাকি শুরু করে অধিকাংশই বিয়েশাদি করি বাবা অইছইন। কিন্তু পদ ছাড়ইন না।

—  কমিটির ঠিক কতজন বাবা?

—  নগর কমিটি তো বাতিল করি দিছে কেন্দ্র। এখন শুধু জেলা কমিটিতে বাবা আছেন। কমিটির তিন ভাগের এক ভাগই বাবা। বাকিরাও বিয়েশাদি করি বাবা অইবার পথও আছইন।’

এই কথোপকথন সিলেট নগর ছাত্রদলের একজন কর্মীর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের। সিলেট এম এ জি ওসমানী হাসপাতালে। গত সোমবারছাত্রদলের ৩৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রায় ছুরিকাঘাতে নিহত ছাত্রদল নেতা আবুল হাসনাতের (৩২) লাশ ছিল এই হাসপাতালের মর্গে। এমসি কলেজের ওই ছাত্রদলকর্মী গতকাল মঙ্গলবার দুপুরেসেখানে এসেছিলেন।

নগর ছাত্রদলের বাতিল হওয়া কমিটির সহসাংগঠনিক আবুল হাসনাতও চার বছর বয়সী একটি মেয়ের বাবা। তাই সিলেট ছাত্রদলে ‘বাবাদের’ প্রাধান্যের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বেশ জোরেশোরেই আলোচনা চলছে।

দলীয় সূত্র জানায়, সিলেটে সর্বশেষ ২০০২ সালের জুন মাসে ছাত্রদলের নগর ও জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল। তিন বছরমেয়াদি সেই কমিটি এক দশকের বেশি সময় পার করে দেয়। ২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সম্মেলন ছাড়াই জেলা ও নগর কমিটির নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করে কেন্দ্র। জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হন যথাক্রমে সাঈদ আহমদ ও রাহাত চৌধুরী। আর নুরুল আলম সিদ্দিকীকে নগর কমিটির সভাপতি ও আবু সালেহ মো. লোকমানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। দুটি কমিটিই আট সদস্যবিশিষ্ট ছিল। ছাত্রদলের নেতৃত্বে বাবাদের সক্রিয়তা এখান থেকেই শুরু বলে মনে করেন ছাত্রসংগঠনটির কর্মীরা।

জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সাঈদ আহমদ পেশায় আইনজীবী। তাঁর সন্তান আছে তিনজন। সাঈদ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক পদেও আছেন। তিনি গতকাল প্রথমআলোকে বলেন, ‘বাবা হয়েছি, এটা তো সবারই জানা। তবে আমরা সব সময় নিজেদের বিদায়ী মনে করি। কেন্দ্র বিদায় দিলেই আমরা বিদায় নেব।’

ওই কমিটি গঠনের এক দিন পর ১৯ সেপ্টেম্বর সভাপতি সাঈদ আহমদকে নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকার একটি বাসায় অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ করেন বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা। নতুন নেতৃত্বে ত্যাগী ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করা হয়নি, এমন অভিযোগে দানা বাঁধা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল সেটি। তখন থেকেই ‘বিদ্রোহী ছাত্রদল’ ও ‘নতুন নেতৃত্বের ছাত্রদল’-এ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তারা পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন শুরু করে।

বিদ্রোহ দমাতে ২০১৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জেলা ও নগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন্দ্রীয় অনুমোদন পায়। জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয় ৭৬২ সদস্যের। এর মধ্যে সহসভাপতি পদে আছেন ৩০ জন। যুগ্ম সম্পাদক পদে ২৪ জন, সহসাংগঠনিক সম্পাদক পদে ২৮ জনসহ ৩০টি সম্পাদকীয় পদে ৩০ জন করে তাঁদের আরও সহযোগী পদে আরও ৬০ জন ছিলেন। বাকিরা কমিটির কার্যকরী সদস্য।

ছাত্রদলকে ‘বাবাদল’ বলে অভিহিত করার বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেল, জেলা কমিটির ওই ৭৬২ নেতার মধ্যে ছয় শ জনের বেশি বিবাহিত। এর মধ্যে সভাপতিসহ পাঁচ শতাধিক আছেন সন্তানের বাবা।

সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মাহবুবুল হক চৌধুরী বললেন, ৭৬২ সদস্যের মধ্যে অন্তত তিন ভাগের এক ভাগ বিবাহিত এবং তাঁরা সন্তানের বাবা। এ অবস্থায় ছাত্রদলকে ‘বাবামুক্ত’ করতে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ওই সিদ্ধান্তের আওতায় ২০০০ সালে বা তার পরে এসএসসি উত্তীর্ণদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হবেজানিয়ে মাহবুবুল হক বলেন, ‘এমনটি হয়েছে আসলে কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ থাকায়। আমরা ছয় মাস আগে হবিগঞ্জ জেলা কমিটি করেছি। ১০ সদস্যের সেই কমিটির সবাই ২০০০ সালে এসএসসি উত্তীর্ণ। সিলেটেও এভাবে করা হবে।’ বাতিল হওয়া সিলেট নগর কমিটিতেও বাবাদের প্রাধান্য ছিল বলে জানান তিনি।

নগর কমিটিও ছিল ৭৬২ সদস্যের। এর মধ্যে সহসভাপতি ২৯ জন ও যুগ্ম সম্পাদক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদক পদে ৫৮ জন। ৩০টি সম্পাদকীয় পদে ৩০ জন ও সহকারী পদে ৬০ জন এবং বাকি সদস্যরা কমিটির কার্যকরী সদস্য।

সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটাতে ব্যর্থ হওয়ায় গত বছরের ৪ এপ্রিল সিলেট নগর ছাত্রদলের কমিটি বাতিল ঘোষণা করে কেন্দ্র। কমিটি বাতিলের পর নগর সভাপতি নুরুল আলম সিদ্দিকী বিদেশ চলে যান। অন্যরাও সংগঠনের কার্যক্রমে অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। সেই থেকে এই আট মাস কোনো কমিটি ছাড়াই চলছে নগর ছাত্রদল। এখন বাতিল কমিটির নেতাদের মাধ্যমে অন্তত ১৩টি পক্ষ (গ্রুপ) সক্রিয় রয়েছে। তাঁদের অনেকে ভবিষ্যতে নতুন কমিটির পদপ্রত্যাশী।

ছাত্রদলের নগর ও জেলা কমিটিতে পদপ্রত্যাশী সাতজনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা সবাই ছাত্রদলে ‘বাবামুক্ত’ ও ছাত্রত্বনির্ভর নেতৃত্ব চান। নগর কমিটিতে স্থান পেতে ইচ্ছুক মদনমোহন কলেজ ও সিলেট সরকারি কলেজের দুজন ছাত্রদল বলেন, সিলেটে এখন ছাত্রলীগের নেতৃত্ব বাবামুক্ত রয়েছে। তারা ছাত্রত্বনির্ভর নেতৃত্ব দিতে পারলে ছাত্রদল কেন পারবে না?

জেলা ছাত্রদলের পদে থাকা আটজনের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরাও বলছেন, ছাত্রদলে ছাত্রত্বনির্ভর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সেটা হলেই কেবল ছাত্রসংগঠনটির কার্যক্রম গতিশীল হবে।

ছাত্রদলের জেলা সভাপতি সাঈদ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি নিজে বাবা হলেও সম্প্রতি কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০০০ সালে বা তার পরে এসএসসি উত্তীর্ণদেরনেতৃত্বের সুযোগ করে দিচ্ছেন। সম্প্রতি বিয়ানীবাজার উপজেলা, পৌরসভা ও কলেজের তিনটি কমিটি ছাত্রদের নিয়েই করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে ছাত্রদলে ছাত্রত্বনির্ভর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে বলে তিনি মনে করেন।

খবরটি সংগ্রহ করেনঃ- Masudur
এই খবরটি মোট ( 59 ) বার পড়া হয়েছে।
add

Share This With Your Friends