বাংলাদেশ | রবিবার, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭ | ৩ পৌষ,১৪২৪

সরকারী দল

22-11-2017 05:07:38 PM

আ’লীগে প্রার্থী জট, সুবিধাজনক অবস্থানে জাতীয় পার্টি

newsImg

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত গাইবান্ধা-১ আসনে নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের নয়জন প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে সরব রয়েছেন। মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন জাতীয় পার্টির একমাত্র প্রার্থীও।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী নির্বাচনে মূল লড়াই হবে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মধ্যে।এলাকায় জামায়াতের প্রভাব থাকলেও নানামুখী চাপে দলটির নেতাকর্মীরা এখন কোণঠাসা। জামায়াতনির্ভর বিএনপি সুযোগের অপেক্ষায়। তবে অনুকূল পরিবেশ এবং জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির বোঝাপড়া যদি শেষ পর্যন্ত অটুট থাকে, তাহলে লড়াই হবে ত্রিমুখী। তখন ভোটের হিসাব পাল্টে যেতে পারে।

সুন্দরগঞ্জ আসনটি জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। এ আসনে দলটি রাজত্ব করছে ২০ বছর। ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালে পরপর দু’বার এ আসন থেকে জাতীয় পার্টির হাফিজুর রহমান প্রামাণিক এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টির সরকার ওয়াহিদুজ্জামান এমপি হন। আসনটি জাতীয় পার্টির হাতছাড়া হয় ২০০১ সালে।ওই নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের মাওলানা আবদুল আজিজ (ঘোড়া আজিজ) এমপি হন। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাব্যুনালের যুদ্ধাপরাধ মামলার পলাতক আসামি। তার নামের আগে ‘ঘোড়া আজিজ’ টাইটেলটি নিয়েও গল্প প্রচলিত রয়েছে।

জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি রাজাকার বাহিনীর নেতা হিসেবে সুন্দরগঞ্জ এলাকায় একদিন রাতের অন্ধকারে একটি শব্দের উৎস লক্ষ্য করে মুক্তিযোদ্ধা ভেবে সেদিকে গুলি ছোড়েন। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন সেখানে একটি ঘোড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। সেই থেকে তার নাম ‘ঘোড়া আজিজ’।এরপর ২০০৮ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আবদুল কাদের খান এ আসনে এমপি নির্বাচিত হলে জাতীয় পার্টি তার হারানো রাজত্ব ফিরে পায়।

কাদের খান এখন আওয়ামী লীগের এমপি মো. মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যা মামলার প্রধান আসামি। তার ঠিকানা এখন গাইবান্ধা জেলা কারাগার। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মো. মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন এমপি নির্বাচিত হলে পুনরায় জাতীয় পার্টির হাতছাড়া হয় আসনটি।

গাইবান্ধা-১ আসনের এমপি আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ার পর ২০১৭ সালের ২২ মার্চ উপনির্বাচন হয়। বিজয়ী হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী গোলাম মোস্তফা আহমেদ। তিনি একাদশ সংসদ নির্বাচনেও দলের মনোনয়নপ্রার্থী।একটি পৌরসভা ও ১৫ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪২৬ জন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. শামসুল হক সরকার নির্বাচিত হন।

আগামী নির্বাচনে বর্তমান এমপি সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা ছাড়াও অপর মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হচ্ছেন- নিহত এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের স্ত্রী জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক খুরশীদ জাহান স্মৃতি, এমপি লিটনের বড় বোন আনন্দ গ্রুপ অব কোম্পানিজ অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর আফরোজা বারী, সুন্দরগঞ্জ পৌর মেয়র উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সৈয়দা মাসুদা খাজা, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম, উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ভালোবাসি সুন্দরগঞ্জ’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রেজাউল আলম রেজা ও সুন্দরগঞ্জ ডিডব্লিউ ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ দলের সাবেক উপজেলা সহসভাপতি আবদুল হান্নান এবং জেলা পরিষদ সদস্য এমদাদুল হক নাদিম।

নির্বাচন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বর্তমান এমপি গোলাম মোস্তফা বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে তিনি দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, এলাকার উন্নয়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। ফলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমার একটা সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আমার প্রতি এলাকার মানুষের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

কাজেই দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আসনটি আওয়ামী লীগকে উপহার দিতে পারব। গোলাম মোস্তফা ৩৫ বছর ধরে দলের উপজেলা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। এরই মধ্যে তিনি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন।জানতে চাইলে প্রায়ত এমপি লিটনের স্ত্রী খুরশীদ জাহান স্মৃতি বলেন, স্বামীর সঙ্গে এলাকার মানুষের জন্য কাজ করেছি। ভোটারদের সঙ্গেও আমার বোঝাপড়া ভালো। তিনি বলেন, স্বামীর অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে দলীয় মনোনয়ন পেতে আগ্রহী।

কথা হয় এমপি লিটনের বড় বোন আফরোজা বারীর সঙ্গে। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা করে তিনি বলেন, সুযোগ পেলে ভাইয়ের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করব। তবে আওয়ামী লীগের শঙ্কার বড় জায়গা হচ্ছে দলের মনোনয়ন প্রার্থীর সংখ্যাধিক্য।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের পর চারদলীয় জোটের জ্বালাও-পোড়াও, বিশেষ করে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর যুদ্ধাপরাধ মামলার রায়ের পর নজিরবিহীন তাণ্ডবের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
বামনডাঙ্গা পুলিশ ফাঁড়িতে জামায়াতের হামলা-অগ্নিসংযোগে ৩ পুলিশসহ ১ আওয়ামী লীগ কর্মীর মৃত্যুর ঘটনাসহ অন্যান্য ঘটনায় স্থানীয় লোকজন কিছুটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে জামায়াত-বিএনপির রাজনীতি থেকে।

একসময় জাতীয় পার্টির দুর্গ ছিল সুন্দরগঞ্জ উপজেলা। আগামী নির্বাচনে এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হতে আগ্রহী ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। তিনি দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আইন ও বিচারবিষয়ক উপদেষ্টা এবং সংগঠনের উপজেলা সভাপতি।

দুর্বৃত্তের গুলিতে লিটন নিহত হওয়ার পর উপনির্বাচনে তিনি জাতীয় পার্টির প্রার্থী ছিলেন। সুন্দরগঞ্জের রাজনৈতিক মাঠে তিনি এখন সরব। তিনি প্রথম নির্বাচনে এসেই ৬০ হাজার ২০০ ভোট পেয়ে পরাজিত হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী গোলাম মোস্তফার কাছে।

নির্বাচন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, গত উপনির্বাচন ছিল জাল ভোটের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। আগামী নির্বাচনে মহাজোটের কিংবা দলীয়ভাবে পৃথক নির্বাচনে জাপা প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তার বিজয় সুনিশ্চিত।

পারিবারিকভাবে ঢাকা, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছাড়াও তাদের ২৮টি দাতব্য প্রতিষ্ঠান জনগণের সেবায় কাজ করছে। দলের মুখপাত্র হিসেবে শামীম পাটোয়ারী বিভিন্ন চ্যানেলে টকশো’তে অংশ নিচ্ছেন। এ কারণে ভোটারদের কাছে তিনি অতি পরিচিত মুখ বলে স্থানীয়রাও মনে করেন।এ আসনে সাংগঠনিকভাবে বিএনপি দুর্বল। বিএনপির রাজনীতি অনেকটাই জোটনির্ভর। তবে নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় নড়েচড়ে বসেছে দলের নেতাকর্মীরা। তারা দল গোছাতে ব্যস্ত।জোটগত নির্বাচন হলে এ আসনে কে প্রার্থী হবেন, তা আগেভাগে বলা কঠিন। তবে এরই মধ্যে বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা মাঠে রয়েছেন।

তারা হচ্ছেন- বিএনপির জেলা কমিটির সহসভাপতি ও সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম এবং দলের উপজেলা কমিটির সভাপতি ও হরিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোজাহারুল ইসলাম। তারা সাংগঠনিক তৎপরতার পাশাপাশি জনসংযোগও চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতা বলেন, এ আসনে জামায়াতের ভোটব্যাংক রয়েছে। জোটের প্রার্থী হিসেবে বিএনপি প্রার্থীর জয়লাভের সম্ভাবনা রয়েছে।তাই দলীয়ভাবে এ আসনকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম বলেন, যদি দল একক বা জোটগত প্রার্থী দেয়, তা হলে মনোনয়ন চাইব। নির্বাচনে লড়ায়ের সুযোগ পেলে জয়লাভ করব। কারণ বর্তমান সরকারের দমনপীড়নের কারণে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ। সাধারণ মানুষ ভোটের মাধ্যমে এর জবাব দেবে।

খবরটি সংগ্রহ করেনঃ- Shakila Sultana lima
এই খবরটি মোট ( 46 ) বার পড়া হয়েছে।
add

Share This With Your Friends