বাংলাদেশ | শুক্রবার, জুন ২৩, ২০১৭ | ৮ আষাঢ়,১৪২৪

অর্থনীতি

19-12-2016 11:21:07 AM

উদ্যোক্তা তৈরির ৩৪৮ কোটি টাকা বেহাত!

newsImg

রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনের চতুর্থ তলার ঠিকানা ব্যবহার করে ৪০ লাখ টাকা মূলধন নিয়েছিল আলফা সফট সিস্টেম। প্রথম কিস্তি ছাড়ের পর থেকে আট বছরের মধ্যে পুরো মূলধন ফেরত দেওয়ার বিধান থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি গত ৮ বছরে ১ টাকাও ফেরত দেয়নি। অর্থ আদায়ে সমমূলধন তহবিল বা ইইএফ ব্যবস্থাপনাকারী সংস্থা ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) প্রতিষ্ঠানটিকে চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েছে।
বিডিবিএল ভবনে গিয়ে আলফা সফট সিস্টেম নামের কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজেও পাওয়া যায়নি। ভবনটির তৃতীয় থেকে নবম তলা পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) কার্যালয়ও পঞ্চম তলায়। বেসিসের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার সহকারী ব্যবস্থাপক বদরুদ্দোজা মাহমুদ নথি ঘেঁটে জানান, আলফা সফট নামে তাঁদের কোনো সদস্য প্রতিষ্ঠান নেই।
যোগাযোগ করা হলে আলফা সফট সিস্টেমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘অফিসের ঠিকানা পরিবর্তন করা হয়েছে। উত্তরায় অফিস ছিল, এখন মতিঝিলে।’ তবে তিনি অফিসের ঠিকানা দিতে পারেননি।
উদ্যোক্তা তৈরিতে সুদবিহীন মূলধনের জোগান দিয়ে এভাবেই বিপাকে পড়েছে সরকার। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও ২২৯ প্রকল্পে দেওয়া ৩৪৮ কোটি টাকা মূলধন উদ্ধার করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে ১৯৭টি কৃষি ও ৩২টি তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রকল্প। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ৮ প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই মিলছে না। অর্থ উদ্ধারে ১৩ প্রতিষ্ঠানকে আইনি নোটিশ দিয়েছে আইসিবি। ১০৪ প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে চূড়ান্ত নোটিশ। এ ছাড়া ৫৫ প্রকল্পের মূল্য নির্ধারণে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ৬ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে। আর অর্থ আদায়ে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে আইসিবি।
কৃষিভিত্তিক ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং খাত দুটির উন্নয়নে ১০০ কোটি টাকা নিয়ে ২০০১ সালে গঠন করা হয়েছিল ইইএফ নামের এই তহবিল। ২০০৯ সাল পর্যন্ত এটি পরিচালনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলত এ সময়ে দেওয়া অর্থের বড় অংশেরই খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ২০০৯ সালের পর তহবিলটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় আইসিবিকে। ইইএফ তহবিল থেকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কৃষি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের ১ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা মূলধন জোগান দেওয়া হয়েছে। তহবিলের নিয়ম অনুযায়ী, ইইএফ সহায়তার প্রথম কিস্তি ছাড়ের দিন থেকে পরবর্তী আট বছরের মধ্যে পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা। এর মধ্যে কৃষিভিত্তিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে তহবিলের প্রথম কিস্তি ছাড়ের ৪ বছরের মধ্যে ২০ শতাংশ অর্থ ফেরত দিতে হবে। বাকি অর্থ পরবর্তী ৪ বছরের মধ্যে ফেরত দেওয়ার নিয়ম। তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রথম কিস্তি ছাড়ের ৪ বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ, ৫ম বছরে ১৫ শতাংশ এবং ৬ষ্ঠ, ৭ম ও ৮ম বছরে ২৫ শতাংশ হারে অর্থ ফেরত দিতে হবে। কিন্তু এ কাজটিই করেননি অধিকাংশ উদ্যোক্তা।তহবিল থেকে দেওয়া মূলধন উদ্ধারের বিষয়ে আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতিখার-উজ-জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা উদ্যোক্তা বানাতে সুদবিহীন মূলধন জোগান দিয়েছি। কিন্তু অনেকেই সময় শেষ হওয়ার পরও অর্থ ফেরত দিচ্ছেন না। যেসব প্রকল্পের টাকা ফেরত দেওয়ার সময় শেষ হয়ে গেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’এ রকমই আরেকটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ইলেকট্রনিকস ডিজিটাল সিস্টেম। ঢাকার ফার্মগেট এলাকার ৭৮ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউতে অবস্থিত ভবনের ৩০৬ নম্বর কক্ষের ঠিকানা ব্যবহার করে তারা ৫০ লাখ টাকা মূলধন নিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আতাউল্লাহ খান। পরিচালক হিসেবে আছেন দেওয়ান আমেনা সুলতানা ও দেওয়ান রাজিয়া সুলতানা।ওখানে গিয়ে ওই ভবনের ৩০৬ নম্বর কক্ষটি বন্ধ পাওয়া যায়। পাশের ৩০৪ নম্বর কক্ষের এনবি ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘২০০০ সাল থেকে এখানে আছি, ৩০৬ নম্বর কক্ষের লোকজনকে খুব কমই দেখেছি। ৫ বছর ধরে কক্ষটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।’ তথ্যপ্রযুক্তি খাতের এ রকম আরও ছয়টি প্রতিষ্ঠানেরও অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এগুলো হলো ড্রিমস সফট, গাংকি লিমিটেড, ইনফরমেশন টেকনোলজি ম্যাট্রিক্স, ইন্টারস্যাট সফটওয়্যার অ্যান্ড সার্ভিসেস, জুপিটার আইটি ও মারফি ম্যাক্কান কনসালটিং।অনেকটা একই অবস্থা কৃষিভিত্তিক শিল্পেরও। যেমন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান পরিচালক আবদুল আওয়াল পাটোয়ারির প্রতিষ্ঠান পাটোয়ারি পটেটো ফ্ল্যাক্স ২০০৮ সালে ইইএফ থেকে ৩ কোটি টাকা মূলধন সহায়তা নেয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ পরিশোধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি।যোগাযোগ করা হলে আবদুল আওয়াল পাটোয়ারি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি দেড় শ কোটি টাকায় প্রকল্প করেছি। অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে ইইএফ থেকে ৩ কোটি টাকা দিয়েছে। প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ না পাওয়ায় ২০০৮ সালের পর এটির কার্যক্রম বন্ধ আছে। আর প্রতিষ্ঠান চলছে না বলে অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন না বলে জানান পাটোয়ারি।অর্থ উদ্ধারে চূড়ান্ত আইনি নোটিশ দেওয়া এই খাতের ১৩ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হবিগঞ্জ এগ্রো প্রসেসিং লিমিটেডের কাছে পাওনা ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এ ছাড়া ইউসুফ এগ্রো কমপ্লেক্সের কাছে ১ কোটি ৪৫ লাখ, ইফাডাপ অ্যাকুয়ার কাছে ৩ কোটি ৪০ লাখ, লালমনি ফিশারিজ হ্যাচারি ও ফিড মিলের কাছে ৫ কোটি ৯৭ লাখ, কোয়ালিটি ফিশারিজ এগ্রো ফরেস্ট্রির কাছে ১৭ কোটি, ফরচুন পোলট্রি হ্যাচারির কাছে ২ কোটি ৫০ লাখ, কক্সবাজার হ্যাচারি অ্যান্ড ফিশারিজের কাছে ৪ কোটি ৬৯ লাখ, আরকে কমোডিটিজের কাছে সাড়ে ৭ কোটি, জাহাঙ্গীর এগ্রো ফিশারিজের কাছে দেড় কোটি, হিজলা এগ্রোর কাছে ১ কোটি ৩৯ লাখ, রিসোর্স টেকনোলোজির কাছে ৫০ লাখ এবং দ্য ডিকোটের কাছে পাওনা ৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা।আবার সব ধরনের নোটিশ, চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়ার পরও অর্থ পরিশোধ না করায় লালমনি ফিশারিজ হ্যাচারি অ্যান্ড মিলের বিরুদ্ধে মামলা করেছে আইসিবি। প্রতিষ্ঠানটি ৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা মূলধন নেওয়ার পর আর পরিশোধ করেনি। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাহবুব হাসান দেশের বাইরে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

খবরটি সংগ্রহ করেনঃ- আই-নিউজ২৪.কম
এই খবরটি মোট ( 358 ) বার পড়া হয়েছে।
add

Share This With Your Friends