বাংলাদেশ | শনিবার, নভেম্বর ১৮, ২০১৭ | ৩ অগ্রহায়ণ,১৪২৪

অর্থনীতি

21-11-2016 09:18:24 AM

বিনিয়োগ ও রফতানিতে সাফল্য কাগুজে

newsImg

শুধু প্রতিশ্রুতি আর নিবন্ধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ দেশের বিনিয়োগ। প্রতি বছর বিদেশীদের যে পরিমাণ প্রতিশ্রুতি আসে, বাস্তবায়ন হয় তার ১০ শতাংশেরও কম। বেশিরভাগ কোম্পানিই নিবন্ধন করে প্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে চলে যায়। হাতেগোনা দু-একটি কোম্পানি বিনিয়োগ করলেও আয়ের বড় অংশই ওইসব দেশের শ্রমিকরা রেমিটেন্স আকারে দেশে নিয়ে যায়। অর্থাৎ বিদেশী কোম্পানি দেশের মানুষের কর্মসংস্থানেও খুব বেশি কাজে আসছে না। আর দেশী বিনিয়োগের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বিনিয়োগ বোর্ড থেকে নিবন্ধনের যে তথ্য প্রকাশ করা হয় তাতে গত তিন মাসেও ধস নেমেছে। কমে গেছে ১০ হাজার কোটি টাকা। অপরদিকে আগের বছরেও যেসব নিবন্ধন হয়েছে তার বাস্তবায়ন একেবারেই কম। বিনিয়োগের এই দুরবস্থা সরকারও স্বীকার করছে। কিন্তু সরকার স্বস্তির জন্য বিনিয়োগের যেসব তথ্য প্রচার করছে, তাও কাগজে সীমাবদ্ধ। কতটুকু বাস্তবায়ন হয়, সরকারি কোনো সংস্থা তার হিসাবও রাখে না। বিনিয়োগ বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা শুধু নিবন্ধনের কাজ করে। কী পরিমাণ বাস্তবায়ন হয়, ওই হিসাব তাদের কাছে নেই। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগের সরকারি তথ্যে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। তাদের সহজ কথা- পরিবেশ নেই, তাই বিনিয়োগ হয় না। বিনিয়োগ না হওয়ার কারণেই দেশের বাইরে অর্থ পাচার হচ্ছে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বিনিয়োগের বিদ্যমান অবস্থা দেশের জন্য অত্যন্ত দুশ্চিন্তার কারণ। প্রতিবছর দেশে যে পরিমাণ বিনিয়োগ আসে তা শুধু প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবায়ন হার একেবারেই কম। এটি অন্যতম দুর্বলতা। তিনি বলেন, জাপানের বিনিয়োগের বিশাল প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। হওয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। এর আগেও বড় কয়েকটি প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু আলোর মুখ দেখেনি। মির্জ্জা আজিজ বলেন, এক কথায় বললে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হয়নি। তার মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সুশাসনের অভাব অনেক দিনের সমস্যা। আর এই দুই সমস্যার কোনো উন্নতি হয়নি। এছাড়া বাংলাদেশের নিয়মিত সমস্যা হল অবকাঠামোগত দুর্বলতা। বিশেষ করে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ। আর গ্যাস না হলে বিনিয়োগ করা যায় না। এসব কারণে বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাচ্ছেন না। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্টে দেশ থেকে অর্থ পাচারের তথ্য উঠে আসছে। মূলত বিনিয়োগে মন্দার কারণেই এভাবে দেশ থেকে টাকা পাচার হতে পারে।
জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৫ সালে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিনিয়োগ বোর্ড। ওই রিপোর্টে বলা হয়, আলোচ্য বছরে দেশে মোট ৯৪ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। আগের বছরের চেয়ে যা প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। এর মধ্যে স্থানীয় বিনিয়োগ ৯০ হাজার ৬০২ কোটি টাকা এবং বিদেশী বিনিয়োগ ৪ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা। একই সময়ে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই এসেছে ২২৩ কোটি ডলার। টাকার অংকে যা প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। এই প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে যুগান্তর।

 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে বিনিয়োগ বোর্ডে যেসব প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছিল এমএএফ পেট্রোকেমিক্যাল নামে একটি কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির পেট্রোকেমিক্যাল খাতে ১১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার কথা। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও এ পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি জানে না বিনিয়োগ বোর্ড। আলোচ্য বছরে দেশীয় শীর্ষ দশ কোম্পানি মোট ২৯ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব করেছে। কিন্তু কোনো কোম্পানির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। এদিকে শুধু বাস্তবায়ন নয়, দেশীয় বিনিয়োগ নিবন্ধনও কমেছে। আগের তিন মাসের তুলনায় চলতি বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০ হাজার কোটি টাকার নিবন্ধন কমেছে। এ সময়ে ২৬৯টি কোম্পানির ১৯ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে। আগের তিন মাসে যা ছিল ২৯ হাজার কোটি টাকা। এ হিসাবে বিনিয়োগ কমেছে ৩৩ শতাংশ।

অন্যদিকে ২০১৫ সালে যৌথ অংশীদারিত্বে বিনিয়োগের জন্য নিবন্ধন করে কানাডার কোম্পানি চুয়াং হুয়া অ্যালুমিনিয়াম। প্রকৌশল খাতে প্রতিষ্ঠানটির ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই। একই অবস্থা সুইডেনের কোম্পানি ডাইনামিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিশ্রুতি ছিল ১২৮ কোটি টাকা। এছাড়া তাইওয়ানের কোম্পানি ফুয়াং চুং হুয়া প্রপার্টি প্রস্তাব করেছিল ৪৮ কোটি এবং চীনের কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপ্লিকেন্টস ৪০ কোটি টাকা। বাস্তবতা হল এসবের কোনোটিরই অগ্রগতি নেই।
জানতে চাইলে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী সদস্য নাভাস চন্দ্র মণ্ডল যুগান্তরকে বলেন, নিবন্ধনের পর বাস্তবায়নের হিসাব ওইভাবে করা হয় না। ধারণা করা হচ্ছে, প্রথম বছরে এক-চতুর্থাংশ বাস্তবায়ন হয়। তিনি বলেন, বিদেশী বিনিয়োগ আসছে। কিন্তু বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ নেই। তার মতে, নতুন বিনিয়োগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা আছে। একেক কোম্পানি একেক ধরনের সুবিধা চায়। যেটা সব সময় দেয়া সম্ভব হয় না।

জানা গেছে, গত চার বছরে বড় অর্থনীতির দেশ থেকে মোটা দাগে দেশে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা ৩ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এসব প্রস্তাবের মধ্যে ভারতের তিন বেসরকারি কোম্পানির ১২ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে ১১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ দেখায় ভারতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি রিলায়েন্স এবং আদানি। এর মধ্যে আদানি ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার এবং রিলায়েন্স ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তা আর বেশিদূর এগোয়নি। এছাড়া ২০১২ সালে আবাসনসহ ৬টি খাতে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছিল ভারতীয় কোম্পানি সাহারা ইন্ডিয়া। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে বেশ কয়েকটি চুক্তিও করেছিল কোম্পানিটি। তবে ওই বিনিয়োগ আর বাস্তবায়ন হয়নি।

গত বছর বাংলাদেশ সফর করেন জাপানের প্রেসিডেন্ট শিনজো আবে। ওই সফরে বাংলাদেশে ৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে জাপানের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং আলাদা নীতিমালা করার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। কিন্তু বিনিয়োগ বোর্ড সূত্র বলছে, জাপানি বিনিয়োগ বাস্তবায়নের অগ্রগতি নেই। গুলশান হামলার পর বিষয়টি কিছুটা স্থবির হয়ে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সফর করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। ওই সফরে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশটির ব্যবসায়ীরা। অর্থনীতিবিদদের ধারণা ওই বিনিয়োগেও খুব একটা অগ্রগতি হবে বলে মনে হয় না।

এদিকে চলতি বছরের জুলাইয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট বিশ্বের বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে বিশ্বের ১৭০টি দেশের বিনিয়োগের তথ্য উঠেছে। এতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব, সুশাসনের অভাব, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তাহীনতা। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগ না হওয়ার পেছনে এগুলো অন্যতম কারণ। এছাড়া সবচেয়ে বড় কারণের মধ্যে গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট তো আছেই।

জানা গেছে, দেশে যে হারে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আসে তা তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। এগুলো হল- নতুন বিনিয়োগ বা ইক্যুইটি ক্যাপিটাল, কোম্পানির মুনাফা পুনঃবিনিয়োগ এবং দুই কোম্পানির মধ্যে পুঁজি বিনিময়। বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্যে দেখা গেছে, গত ৫ বছরে দেশে ৭৮১ কোটি ডলার এফডিআই’র প্রতিশ্রুতি এসেছে। এর মধ্যে নতুন বিনিয়োগ ১৪৪ কোটি ডলার, পুনঃবিনিয়োগ ৩৯০ কোটি এবং পুঁজি বিনিময় ১৪৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগ নিবন্ধনের হার কমছেই। তবে বিনিয়োগ নিবন্ধনের পর তা বাস্তবায়ন হয় কিনা তা নজরদারি করছে না বিনিয়োগ বোর্ড।

খাতভিত্তিক বিবেচনায় এক বছরে সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি এসেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। নিবন্ধিত এই বিনিয়োগের পরিমাণ ৫৮ কোটি ডলার। একক দেশ হিসেবে বিনিয়োগ বেশি নিবন্ধন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু করমুক্ত সুবিধা নিয়েও বিনিয়োগের মাধ্যমে যে টাকা আয় হয় তা বাংলাদেশীদের খুব বেশি কাজে আসছে না। কারণ বর্তমানে বিনিয়োগ বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১০১ জন নাগরিক এ দেশেই কাজ করছে। বিনিয়োগ বোর্ড বলছে, এদের মাসিক গড় বেতন ১০ লাখ টাকার কম নয়। এ হিসাবে এসব জনশক্তি বছরে ১২০ কোটি টাকার মতো বেতন পায়। এছাড়াও বর্তমানে বিনিয়োগ বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে ৫ হাজার ৯৯৩ জনশক্তি কাজ করে। ইপিজেড এবং এনজিও ব্যুরোর অনুমোদন নিয়ে কাজ করে আরও ৯ হাজার বিদেশী জনশক্তি। ২০১৫ সালে এরা নিজ দেশে ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স নিয়ে গেছে।

বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুসারে একটি দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য মৌলিকভাবে ৭টি পূর্ব শর্ত রয়েছে। এগুলো হল- পুঁজির সহজলভ্যতা, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ, পর্যাপ্ত জমি, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহসহ উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্থিতিশীল কর কাঠামো, দক্ষ শ্রমিক এবং আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে সহজ ব্যবস্থাপনা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এর সবগুলোতেই পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বাংলাদেশ সফরে এফডিআই নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এফডিআই মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনামে তা ৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। তার মতে, কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে এফডিআই বাড়ানোর বিকল্প নেই।
এ ব্যাপারে মির্জ্জা আজিজ যুগান্তরকে আরও বলেন, বিশ্বব্যাংকের হিসাবে সুশাসন ও আইনশৃংখলা পরিস্থিতির দিক থেকে বাংলাদেশের স্কোর ২০। এর অর্থ হল ১০০টি দেশ থাকলে বাংলাদেশের অবস্থান ৮০ নম্বরে। এছাড়া দেশের অন্যতম সমস্যা দুর্নীতি। রয়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এসব সমস্যা সমাধানের কোনো লক্ষণ নেই। তিনি বলেন, সরকারের দাবি ঋণের সুদের হার কিছুটা কমেছে। এর কারণ ঋণের চাহিদা নেই। বড় উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে চায় না। এজন্য বিভিন্ন উৎসাহ-উদ্দীপনার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের চাহিদা তৈরি করতে হবে। কিন্তু এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেই।

আয়ের ৬০ ভাগ ব্যয় কাঁচামাল আমদানিতে

তৈরি পোশাকের রফতানি আয়ে বিরাট সাফল্যের দাবি কেবল কাগজে-কলমে। বাস্তবে এ কাগুজে হিসাবের সঙ্গে প্রকৃত রফতানি আয়ের কোনো মিল নেই। গত পাঁচ অর্থবছরে ১১ হাজার ৮৬৮ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের পোশাক রফতানি হয়েছে। কিন্তু এই পোশাক রফতানি উপযোগী করতে কাঁচামাল আমদানিতেই খরচ হয়ে গেছে ৭ হাজার ৫২৬ কোটি ডলার। এছাড়া দক্ষ জনশক্তি আমদানি এবং জরুরি প্রয়োজনে বিমানে পণ্য পাঠানোর অতিরিক্ত ব্যয় বাবদ আরও খরচ হয়েছে ২ হাজার ৫শ’ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে মোট রফতানি আয় থেকে এসব ব্যয় বাদ দিলে দেখা যায় প্রকৃতপক্ষে পোশাক খাত থেকে গত পাঁচটি অর্থবছরে (২০১১-১২ থেকে ২০১৫-১৬) নিট রফতানি আয় হয়েছে ১ হাজার ৮৪২ কোটি ডলার। এক হিসাবে ওভেন গার্মেন্ট ও নিটওয়্যার মিলে যা রফতানি আয় হয় তা থেকে কাঁচামাল আমদানিতে চলে যায় ৬০ ভাগ। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এনবিআর থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে যুগান্তরের অনুসন্ধানে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

তৈরি পোশাকের দুই উপখাতের একটি হচ্ছে ওভেন গার্মেন্ট। এ খাতে ৮০ শতাংশ কাঁচামালই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। একইভাবে নিটওয়্যারেও গড় মূল্য সংযোজন ৬০ শতাংশের বেশি করা যাচ্ছে না। এতে দেখা গেছে, দুই উপখাতের চাহিদাযোগ্য সার্বিক কাঁচামালের গড় আমদানি হার (ওভেনে ৮০ শতাংশ+ নিটে ৪০ শতাংশ)= ১২০/২=৬০ শতাংশ। একইভাবে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের হার (ওভেনে ২০ শতাংশ+ নিটে ৬০ শতাংশ)= ৮০/২=৪০ শতাংশের বেশি নয়।

যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৫ সালের একটি প্রতিবেদনে উভয় খাতে মূল্য সংযোজন হার ৭৫ শতাংশ বলে দাবি করা হয়। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় বর্তমানে ১০০ ডলারের পোশাক রফতানি করলে ৭৫ ডলার দেশে থাকছে। ২৫ ডলার খরচ হচ্ছে কাঁচামাল আমদানিতে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, এ খাতে উপকরণ সরবরাহের ক্ষেত্রে স্থানীয় মূল্য সংযোজন হার ৬০ শতাংশের সমান। অর্থাৎ ৪০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। কিন্তু বাস্তবে আমদানি ব্যয় সংক্রান্ত এসব পরিসংখ্যানের কোনো মিল নেই।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ শনিবার যুগান্তরকে বলেন, এ অবস্থার এখন পরিবর্তন হচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতের উপকরণ সরবরাহে দেশেই বিভিন্ন ব্যাংকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে উঠেছে। সরকার থেকেও তাদের নীতিগত সহায়তা বাড়ানো হচ্ছে। ফলে পর্যায়ক্রমে তৈরি পোশাক খাত স্বনির্ভরতার দিকে এগোচ্ছে। এখন আমদানির চেয়ে রফতানির পরিমাণ বেশি হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে এভাবেই রফতানি আয়ের হিসাব বের করা হয়। কারণ ক্রয়াদেশের বিপরীতে রফতানি থেকে প্রাপ্ত অর্থই হচ্ছে মোট রফতানি আয়।

তবে সরকারের এ দাবির সঙ্গে একমত হতে পারেননি খোদ পোশাক শিল্পোদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি মো. ফজলুল হক এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, সরকারের উচিত রফতানিতে প্রকৃত আয় দেখানো। কারণ আয়ের সিংহভাগ অর্থ তো কাঁচামাল ও এক্সেসরিজ আমদানিতে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই।

জানা গেছে, গত পাঁচটি অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে রফতানি আয় হয় ১১ হাজার ৮৬৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে ২০১১-১২ অর্থবছরে ১ হাজার ৯০৯ কোটি ডলার, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২ হাজার ১৫১ কোটি ডলার, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২ হাজার ৪৪৯ কোটি ডলার, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৫৪৯ কোটি ডলার এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৮১০ কোটি ডলার। কিন্তু এর বিপরীতে এই পাঁচটি অর্থবছরে কাঁচামাল আমদানি করা হয় ৭ হাজার ৫২৬ কোটি ডলার। এর মধ্যে ২০১১-১২ অর্থবছরে ১ হাজার ৩৩৬ কোটি ডলার, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১ হাজার ৫০৬ কোটি ডলার, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৬৯ কোটি, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৫২৯ কোটি ডলার এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৮৬ কোটি ডলার।

অপরদিকে কাঁচামাল আমদানি ব্যয়ের পর নিট রফতানি অর্থেও ভাগ বসাচ্ছেন এ খাতে কর্মরত উচ্চ বেতনের বিদেশী নাগরিকরা। গত ৫ বছরে তারা বেতন বাবদ নিজ দেশে নিয়ে গেছেন প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার। এ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা থেকে সরকারের রাজস্ব প্রাপ্তি প্রায় শূন্য। এছাড়া রফতানি কার্যাদেশের ক্ষেত্রে নানা কারণে সময়মতো শিপমেন্ট সরবরাহে ব্যর্থতাও নিত্যসঙ্গী। এর জন্যও প্রতি বছর এ খাতে গড়ে ১ বিলিয়ন ডলার হারে ৫ বছরে আরও ৫০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত খরচ হয়েছে। ক্রয়চুক্তির বাইরে গিয়ে বায়াররা এ বাড়তি খরচ পোশাকের দামে কখনই পুষিয়ে দেন না।

উল্লেখিত হিসাব বিশ্লেষণে এটিই প্রতীয়মান হয়, গত পাঁচ অর্থবছরে সরকার কাগজ-কলমে তৈরি পোশাক খাতে রফতানি আয় ১১ হাজার ৮৬৮ কোটি ডলার দাবি করলেও বাস্তবে এর কোনো মিল নেই। ওপরের উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী ক্রয়াদেশ ধরে হিসাব করা রফতানি আয় থেকে কাঁচামাল আমদানিসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বৈদেশিক ব্যয় বাদ দিলে এ খাতে নিট রফতানি আয় হয়েছে ১ হাজার ৮৪২ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএর) সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম যুগান্তরকে বলেন, সরকারের সহায়তার অভাবে দেশের পশ্চাৎসংযোগ শিল্প দাঁড়াতে পারছে না। গ্যাস, বিদ্যুতের সংকট, চড়া ব্যাংক ঋণের সুদ, গলাকাটা সার্ভিস চার্জসহ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এই শিল্পের বিকাশে বড় বাধা। ফলে তৈরি পোশাক খাতে মূল্য সংযোজনের হার বাড়ছে না।
তবে বাংলাদেশ রফতানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, আগে শুধু সেলাইয়ের খরচ পাওয়া যেত। এখন সেলাইয়ের পাশাপাশি সুতা ও কাপড়, এক্সেসরিজ, এমব্রয়ডারি, ধৌত করাসহ উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরে কিছু মূল্য সংযোজন বাড়ছে।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠনের (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, তৈরি পোশাকে এখন গড়ে ৫৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে মূল্য সংযোজন হচ্ছে। এর মধ্যে নিটের ৮০ শতাংশ এবং ওভেনে ৩০ শতাংশ। এর বেশি মূল্য সংযোজন ঘটাতে চাইলেও সম্ভব হবে না। কারণ এ দেশে তুলার উৎপাদন হয় না।

জানতে চাইলে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মাফরূহা সুলতানা যুগান্তরকে বলেন, যে কোনো ব্যবসায় আয়-ব্যয়ের হিসাবে নিট আয় হচ্ছে আসল মুনাফা। এটিই যৌক্তিক হিসাব। কিন্তু রফতানি আয়ের হিসাবটি ভিন্ন। এখানে আমদানি ব্যয় আলাদা করে দেখানোর সুযোগ নেই। তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন উইন্ডো রয়েছে। একেকটি প্রতিষ্ঠান একেক কাজ করে। ইপিবি মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের এলসি তথ্য এবং এর বিপরীতে এনবিআরের প্রাপ্ত রাজস্ব তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে হিসাব বের করে। এখানে দেখা হয়, দেশ থেকে কি পরিমাণ পণ্য রফতানি হচ্ছে এবং তার বিপরীতে কি পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাচ্ছে। রফতানি প্রতিবেদনে সেটিই প্রকাশ করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে কত মূল্য সংযোজন হচ্ছে বা এ রফতানির জন্য কি পরিমাণ আমদানি হচ্ছে সেগুলো বিবেচনা আমরা করি না। এর জন্য ডোর টু ডোর হিসাব সংগ্রহ করাও সম্ভব নয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মোট রফতানি আয়ের ৮১ শতাংশ অবদান তৈরি পোশাক খাতের। কর্মসংস্থানেও শীর্ষে এ খাত। সরকারও এ খাতে রফতানি আয়ে ক্রমোন্নতির ফিরিস্তি দিচ্ছেন। কিন্তু খাতটির পরনির্ভরশীলতা কিভাবে কাটিয়ে তোলা যায় সে ব্যাপারে বিশদ চিন্তা ও পরিকল্পনা এখনও নেয়া হয়নি।

খবরটি সংগ্রহ করেনঃ- আই-নিউজ২৪.কম
এই খবরটি মোট ( 436 ) বার পড়া হয়েছে।
add

Share This With Your Friends