বাংলাদেশ | শুক্রবার, নভেম্বর ২৪, ২০১৭ | ৯ অগ্রহায়ণ,১৪২৪

জনগণ / তত্তাবদায়ক সরকার

26-10-2016 11:19:10 AM

একজন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম . . .

newsImg

১/১১ এর দিনগুলো। একের পর এক নেতা গ্রেফতার হচ্ছেন, কেউ গ্রেফতার হবার ভয়ে পালটি মারছেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বাড়ি সুধা সদনেই পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা কেটে যায়। মাঝে অনেক কথা। সেগুলো আজ লিখবো না, কারণ আজকের লেখার বিষয় শুধুই সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। শেখ হাসিনা গ্রেফতার হয়ে গেলেন, নৌকার হাল ধরলেন বঙ্গবন্ধু পরিবারের আত্মার আত্মীয় মো. জিল্লুর রহমান। সংবাদ কর্মীদের বিকেলের ঠিকানা গুলশানের আইভি কনকর্ড। জিল্লুর রহমানের আবাসস্থল। সংবাদ পেতে পেতে কখনো বিকেল কখনো সন্ধ্যা। কারণ জিল্লুর রহমান শারীরিকভাবে সুস্থ নন। বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে বা সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি।দিন-তারিখ বলতে পারবো না, হয়তো দু-একজনকে ফোন করলে নির্দিষ্ট করে বলতে পারবেন। লন্ডন থেকে এসে প্রবীন জিল্লুর রহমানের পাশে সাহস হয়ে দাঁড়ালেন সেই  কালো ব্যাগ হাতে সফেদ পাঞ্জাবি পরিহিত মানুষটি। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। খুব একটা আশাবাদী হতে পারলাম না (নিজের স্বল্প জ্ঞানের কারণে)। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ পাশের এমপি হোস্টেলের ৫নং ভবনে থাকা শুরু করেছেন তিনি। কয়েক দিন পরে যাওয়া শুরু করলাম সেখানে। সকালে নিউজ দরকার, টেলিভিশনে কাজ করি, সন্ধ্যায় জিল্লুর রহমানের কাছ থেকে নিউজ পাই, আর সারা সকাল যায় খালি।এমপি হোস্টেলের বাসায় দুটো মানুষের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। আওয়ামী লীগের বিদায়ী কমিটির উপ প্রচার সম্পাদক অসীম কুমার উকিল ও বিদায়ী সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক। প্রধান দরজা দিয়ে ঢুকেই হাতের বাম পাশে ডাইনিং টেবিল ছিল, সেখানে এই দুই জন চা পান ও ধুমপান করতেন। দুজনের সাথেই সুসম্পর্ক থাকার কারণে সরাসরি তাদের সাথে যোগ দিতাম শুধু চা পানে। সাধারণত ১০টা সাড়ে ১০টার মধ্যে আমি যেতাম। সৈয়দ আশরাফ তখন ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃরাশ সেরেছেন বা সারছেন, এমনটাই ঘটতো।

চা পান শেষ হলে আমি পাশের ড্রইং রুমে গিয়ে বসতাম। সাধারণত অল্প কিছু সময় অপেক্ষার পরই আশরাফ ভাইয়ের সাক্ষাত পেতাম। আমি ভাগ্যবানদের মধ্যে একজন, প্রতিদিন না হলেও প্রায়ই আশরাফ ভাইকে ক্যামেরাবন্দী করতাম। অবশ্য অসীম দা আর মোজাম্মেল ভাইয়ের অবদান কম নয়, তারা এ কাজটিতে আমাকে সাহায্য করতেন সব সময়।

সহকর্মী ক্যামেরাম্যানকে বাইরে রেখেই আশরাফ ভাইয়ের রুমে যেতাম। উনাকে যেদিন রাজি করাতে পারতাম (আসলে উনি যেদিন বলবেন বলে ঠিক করতেন) সেদিনই সহকর্মীকে ডেকে পাঠাতাম ভেতরে। আমার প্রতিদিনের রুটিন ছিল সকালে আশরাফ ভাইয়ের এমপি হোস্টেলের বাসায় যাওয়া। অল্প দিনেই মানুষটার ফ্যান হয়ে গেলাম। মার্জিত কথা বলা, যতটুকু দরকার ততটুকুই বলা, চেহারা দেখানোর বাতিক না থাকা ইত্যাদি সবার জানা।

তার বাসার জানালা দিয়ে সরাসরি সংসদের পুরো চিত্রটি দেখা যেত। আশরাফ ভাইয়ের লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনাকে মুক্ত করে তার নেতৃত্বে ওই জাতীয় সংসদে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার। সে সময় এটি কোনো সহজ কাজ ছিল না, ভয়ভীতি আর প্রলোভনে কত শত জন যে পথ হারিয়েছেন, তখন সৈয়দ আশরাফ ছিলেন অবিচল তার লক্ষে। একদিকে দলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখা, ঐক্য ধরে রাখা, বিদেশি কূটনীতিকদের সমর্থন আদায় করা আর অন্যদিকে সেনাবাহিনী  সমর্থিত  সরকারের সাথে চোয়াল শক্ত রেখে দাবি আদায় করা, কত কঠিন কাজ।

ক্রাইসিস ম্যান সৈয়দ আশরাফ সেই লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়েছিলেন। এ যে রক্তের টান, পিতার অসমাপ্ত কাজ তিনি শেষ করেছিলেন। পিতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত যেভাবে বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিয়ে গেছেন, চরম বিপদের দিনে পুত্র সৈয়দ আশরাফও শেখ হাসিনার জন্য লড়ে গেছেন। কিছু রক্ত কখনো কোনদিন কোন অবস্থাতেই বেইমানি করে না। তার জ্বলন্ত প্রমাণ সৈয়দ আশরাফ। সৈয়দ আশরাফকে ক্রাইসিস ম্যান কেন বললাম সেই ব্যাখা আরেক দিন দেব।

সকাল বিকাল ক্যামেরার সামনে না আসা, অনেক নেতা কর্মীদের তেল গ্রহণ না করা, তদবির না শোনা, দুর্নীতি না করা- এমন হাজারো অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। শুধু সাধারণ মানুষই নয়, দেশে যারা আওয়ামী লীগের নিরব সমর্থক, যারা শুধু বঙ্গবন্ধু ও তার কন্যা শেখ হাসিনাকে ভালোবাসেন তারা এমন মানুষই চান। গুটিকয়েক ধান্ধাবাজ, তেলবাজ, সু-সময়ের সাথীদের সৈয়দ আশরাফকে পছন্দ নয়।

নিজে ঘন ঘন ক্যামেরার সামনে না আসার কারণ হিসেবে একদিন বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সব বিষয়ে কথা বলবে কেন? সে শুধু নীতি নির্ধারণী বিষয়ে কথা বলবে। আর মিডিয়ার সামনে কথা বলার জন্য তো, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তো আছেনই।’ সৈয়দ আশরাফ শুধু নিজেই নেতা হতে চান নাই। নেতৃত্ব গড়তে সুযোগ দিয়েছিলেন। তার কারণেই মাহবুব উল হানিফ নিজেকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছেন।

কথা কম কাজ বেশি- এমন নীতিতেই কাজ করেন সৈয়দ আশরাফ। সাংবাদিক বান্ধব নন, কর্মী বান্ধব নন, তবে তিনি দলের প্রতি বিশ্বস্ত, তার নেত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত আর সর্বোপরি কাজটা কিভাবে করতে হয় সেটা ভালো করেই জানতেন আশরাফ। সততা ও শালীনতা দিয়ে সবার মন জয় করা এই রাজনীতিক কতটা যে দলের কর্মীদের মনের মাঝে জায়গা করে নিয়েছেন তা সেদিন কাউন্সিলেই দেখা গেছে।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মত রাজনীতিকদের ক্রাইসিসের সময়ই চেনা যায় এবং মূল্যায়ন হয়। রাজনৈতিক বিটের কর্মী হিসেবে সবশেষে এটিই বলতে পারি, তার মতো রাজনীতিককে ভবিষ্যতে দরকার পড়বে।

 

খবরটি সংগ্রহ করেনঃ- আই-নিউজ২৪.কম
এই খবরটি মোট ( 350 ) বার পড়া হয়েছে।
add

Share This With Your Friends