বাংলাদেশ | শনিবার, নভেম্বর ১৮, ২০১৭ | ৩ অগ্রহায়ণ,১৪২৪

সম্পাদকীয়

16-05-2015 09:09:48 AM

দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবর

newsImg

জামাল উদ্দিন দামাল: দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবর। ১৯৭২ সালের ২৫ মার্চ কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দিনটি ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন। তাঁর পিতা মরহুম এডভোকেট আলী আকবর ও মাতা রোকেয়া আকবর। স্ত্রী মিতু আকবর। দুই ছেলে রণ ও রুদ্র। জনপ্রিয় এই শিল্পীর সাধনা শুরু হয়েছিল শ্রীমতি কল্যাণী সেন গুপ্তার হাতে। মূলত: শৈশবে এই শিক্ষিকাই আসিফ আকবরকে নানাভাবে শিল্পের প্রতি উজ্জীবিত করেছিল। ১৯৯৮ সালে চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের সাথে যুক্ত হন। সে সময়ে নবীণ এই শিল্পীর সাথে প্লেব্যাকে সহশিল্পী হিসেবে গান গেয়েছিলেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ডলি সায়ন্তনী। তাঁর গাওয়া প্রথম ছবির নাম ‘রাজা নাম্বার ওয়ান’। বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। এ পর্যন্ত অসংখ্য চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন তিনি। প্রখ্যাত সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার সামিয়া জামানের ‘রানী কুঠির বাকী ইতিহাস’ চলচ্চিত্রে গান গেয়ে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। এটা আমাদের কুমিল্লাবাসীর জন্য গৌরবের ব্যাপার। শিল্পী আসিফ ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।

এখনো মনে আছে আসিফ ভাই ৭/৮ বছর পূর্বে কুমিল্লা এস.আর কমিউনিটি সেন্টারে কুমিল্লার সুশীল সমাজকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে সুস্থধারার চলচ্চিত্রের উপর লেখা আমার একটি বই উপহার দিয়েছিলাম। সে সময় আমার সাথে ছিলেন কুমিল্লার বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বদরুল হুদা জেনু ভাই। আমার সেই ছবিটি ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন আমার সাংবাদিক বন্ধু কুমিল্লার কাগজের নির্বাহী সম্পাদক-ফিচার মিডিয়া ফোরামের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির জীবন। এভাবেই দিন কাটছিল। তারপর ২০০৮-এর ১৫ ডিসেম্বর সোমবার প্রিয় শিল্পী আসিফ ভাইয়ের একটি বিশাল সাক্ষাৎকার আমি নিয়েছিলাম তার বাসায় বসে। সেটি ১৭ ডিসেম্বরের সাপ্তাহিক নিরীক্ষণে বিশাল আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। সেদিন আমার সঙ্গে ছিলেন আমার সাংবাদিক বন্ধু মনির হোসেন। মূলত: ওই সাক্ষাৎকারটি ছাপার পর থেকে আসিফ ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে ওঠে। যেহেতু আমি সুস্থধারার চলচ্চিত্র নিয়ে গবেষণা করছি দীর্ঘ একযুগ যাবৎ-সেই সুবাধে কুমিল্লাতে একাধিক চলচ্চিত্র উৎসবের সাথেও আমি সম্পৃক্ত ছিলাম। এর ধারাবাহিকতা এখনো আছে। সুস্থধারার চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের অনেক বরেণ্য চলচ্চিত্রকারের সাথে আমার সম্পর্ক গড়ে উঠে। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- প্রয়াত তারেক মাসুদ, প্রয়াত সজল খালেদ (এভারেস্ট বিজয়ী), জাঁ-নেসার ওসমান, কুমিল্লার কৃতিসন্তান খিজির হায়াত খানসহ আরও অনেকের সাথে। আর এসব কাজে উৎসাহ মূলত শিল্পী আসিফ ভাইয়ের কাছ থেকেই পেয়েছি। আমার পরবর্তী বই ‘সেলুলয়েডের লাল কবিতা’ গ্রন্থটিতে আসিফ ভাইকেও নিয়ে তিনটি পর্ব থাকবে। আমার দেখায় তিনি প্রচন্ড সাহসী ও সংগ্রামী মানুষ। অনেক সাধনা ও কষ্টের পর তিনি সংগীতাঙ্গনে বিশাল স্থান অর্জন করেছেন। সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ তাকে চেনেন এবং জানেন। কণ্ঠশিল্পী আসিফ ভাইকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ ঘটেছে আমার। মানুষ হিসেবে একজন বিশাল মনের মানুষ তিনি। আমি তাকে প্রচন্ড শ্রদ্ধা করি। তিনিও আমাকে ছোট ভাই হিসেবে যথেষ্ট স্নেহ ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহ দিয়ে থাকেন।

অনেক কারণেই আমি আসিফ ভাইয়ের একজন সিরিয়াস ভক্ত। তার অনেক গান আমাকে সীমাহীন মুগ্ধ করে। বলা চলে তাঁর বেশ কয়েকটি গানে আমি বেঁচে থাকার প্রেরণা পেয়েছি। তাঁর অধিকাংশ গানই বিরহের ছবি আঁকে। নক্ষত্রসম এই শিল্পীর জনপ্রিয়তা কত বেশি তা কুমিল্লার বাইরে গেলে অনুভব করা যাবে। দেশের উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ এই শিল্পীকে রীতিমত স্বপ্নের মানুষ হিসেবে কল্পনা করে। ঢাকা শহরে বিশেষ করে গুলশান-বনানী-বারিধারা-ধানমন্ডি এলাকায় শিল্পীর প্রবেশাধিকার হয়তো লিমিটেশন রয়েছে; কিন্তু সমগ্র বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি আজ উদ্ভাসিত। এই শিল্পীর জনপ্রিয়তা অনুধাবন করতে হলে সারাদেশ ঘুরতে হবে-আমজনতার সাথে মিশতে হবে। কোটি কোটি আমজনতা তাঁকে প্রচন্ড ভালোবাসে। যারা শিল্পীর কণ্ঠের গান শুনলে বিমোহিত হয়ে পড়েন-ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়ান। তাঁর একাধিক জনপ্রিয় গান রয়েছে- সেসব গান একবার শুনলে বারবার শুনতে ইচ্ছে হয়। এককথায় বলতে পারি-ঢাকা শহরের ৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় সব শিল্পীরা রয়েছেন-আর বাকী পুরো বাংলাদেশেই রয়েছেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবর। তাঁর প্রথম অ্যালবাম ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’ ২০০১ সালে বেরিয়েছিল। সারাদেশে ব্যাপক আলোচিত ও সমাদৃত হয়েছিল। এ পর্যন্ত ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’ অ্যালবামটি বিক্রি হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ কপি। ২০১০ এর ১৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে গান ছেড়ে দিয়েছিলেন আসিফ আকবর। গানের জন্য অনেক যুদ্ধ করেছেন-শিল্পীদের অধিকার আদায় করার অনেক সংগ্রাম করেছেন। সেই সময় সঙ্গীতাঙ্গনকে থেকে বিদায় নেবার ঘোষণা দেবার পর দেশের বড়মাপের শিল্পীরা আসিফ আকবরকে তার সিদ্ধান্ত পাল্টানোর জন্য অনেক অনুরোধ করেছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-আবদুল হাদী, সুবীর নন্দী, রুনা লায়লা, কুমার বিশ্বজিৎ, আইয়ুব বাচ্চু। তারপর সময় গড়িয়ে গেল বেশ কিছুদিন। ভক্তদের অনেক অনেক অনুরোধে প্রিয় শিল্পী আসিফ ভাই আবারও গানের জগতে ফিরে এলেন। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে লাইভ প্রোগ্রামে গাইছেন, কনসার্ট করছেন। বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে গাইছেন। সব মিলিয়ে আসিফ ভক্তদের জন্য এখন খুশির খবর।

ফেইসবুকে আসিফ ভক্তদের অবস্থান : কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরের জনপ্রিয়তা কতটুকু তা অনুধাবন করা যায় ফেইসবুকে বসলে। আমার ‘জামাল-দামাল’ ফেইসবুক আইডিতে অসংখ্য আসিফ ভক্ত প্রতিদিন আসিফ আকবরের খবর জানতে নিয়মিত চ্যাটিং করে থাকেন। আমার পুরো ফেইসবুক আসিফ ভাইয়ের ছবিতে ভরপুর। আসিফ ভাইয়ের সাথে বিভিন্ন সময়ে তোলা আমার ছবিগুলি দিয়ে ফেইসবুক আইডিটি সাজিয়েছি। সেই ছবি দেখে দেশের সকল আসিফ ভক্তরা আমার সাথে ফ্রেন্ডলিস্টে যুক্ত হয়েছে।

সংগীত জীবনে শিল্পী আসিফ আকবরের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে- (১) প্রথম অ্যালবাম : ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’-এ পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ কপি, ‘তুমি’ শিরোনামে মোট ১০টি অ্যালবাম প্রকাশ হয়েছে, ১৯টি একক-১০৭টি মিশ্র অ্যালবাম বের হয়েছে সাউন্ডটেকের ব্যানারে, ১০টি থিম কালারে অ্যালবাম প্রকাশ-২০০৫ থেকে, ২০০৯ জুন মাসে বসুধা-আর্ব এন্টারটেইনমেন্ট প্রতিষ্ঠা। অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা : ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’ অ্যালবামটি ৩০ লাখ কপি বিক্রি হয়েছিল ২০০১, ‘তুমি সুখী হও’, ‘তুমি কথা রাখোনি’, ‘তুমিও কাঁদবে একদিন’ [প্রতিটি ২০-২৫ লাখ কপি বিক্রি]-২০০২, ‘সুখে থাকো তুমি বান্ধবী’, ‘পাষানী তুমি পাষানী’, ‘কেন তুমি সুখে থাকবে’, ‘তুমিই মনে রাখোনি’-২০০৩, ‘একবার বলো তুমি’, ‘কেন তুমি সুখে থাকবে’, ‘তুমিই ভালোবাসনি’-২০০৪, ‘তবুও ভালোবাসি’, ‘বাঁচবো না’, ‘জবাব দাও’-২০০৫, ‘অভিনয়’, ‘সংসার’, ‘বন্দি’-২০০৬, ‘হৃদয়ে রক্তক্ষরণ’, ‘বৈকালের চাঁদ’, ‘শর্ত’-২০০৬, ‘কিছু ভুল কিছু স্মৃতি’, ‘এখনো জোছনা দেখি’, ‘এক ফোটা অশ্র“’-২০০৮, ‘বন্ধু তোর খবর কীরে?’, ‘পানি নাই চোখে’, ‘সেই দিনগুলি কই’-২০০৯।

আসিফ আকবরের জনপ্রিয় বেশ কয়েকটি গান হচ্ছে : বুকের জমানো ব্যথা-কান্নার লোনা জলে-ঢেউ ভাঙ্গে চোখের নদীতে-অন্যের হাত ধরে-চলে গেছো দূরে-পারিনা তোমায় ভুলে যেতে-ও প্রিয়া তুমি কোথায়, কখনও ভালোবাসনি-করেছো শুধু অভিনয়, এখনও মাঝে মাঝে-মাঝ রাতে ঘুমের ঘোরে-শুনি তোমার পায়ের আওয়াজ, ক্ষমা করে দিও আমাকে-ভুলতে পারিনা তোমাকে-চলে গেছো অনেক দূরে-আসবে না জানি ফিরে, নিষ্ঠুর তুমি-বড়ই নিষ্ঠুর তুমি-এ হৃদয় করেছো মরুভূমি, যারে ভালোবাসি আমি সেই কাছে নাই, আমার দু:খ সারি সারি-তোমার অবিশ্বাসী মন, জ্বালা জ্বালা অন্তরে-জ্বালা জ্বালা বুকের ভেতরে, জানি ভালোবাসো না আজ তুমি আমাকে-তবুও বারে বারে এই মনে ফিরে পেতে চায় তোমাকে-সঞ্চিতা ফিরে এসো-এই হৃদয়ে, তুমি বলো আলো-আমি বলি আঁধার-তোমার আমার এই তো শুধু ব্যবধান, আমার মাঝে নেই এখন আমি-স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে যেন স্বর্গে নামি-যেন অন্যতম এক ভালোবাসাতে, স্বপ্ন তুমি-কবিতা তুমি, বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় তোমার কথা ভাবছি, একলা ঘরে পড়ে আছি কেউ দেখেনা, থাকবো না মরে যাবো-ওপারে চলে যাবো, এই এমন সম্পর্ক-চার দেয়ালে থাকে বন্দী, যেতে চাইলে কাউকে ধরে রাখা যায় না, তুই যদি চন্দ্র হতি বাঁশ বাগানের মাথায়, দু:খ দিতে সবাই জানে-সইতে পারে ক’জন-আমি এক দু:খওয়ালা, কিছু ভুল-কিছু স্মৃতি-করে দিলো এলোমেলো-এই জীবন-কিছু গান-কিছু ব্যথা-করে দিলো বিষাদ কালো-এই জীবন-কিছু গান-কিছু ব্যথা-করে দিলো বিষাদ কালো-এই জীবন, বন্ধু তোর খবর কী রে?-এখনও কি খুঁজিস তুই-বুড়িগঙ্গার বুকের ভেতর, বুক ভরা যন্ত্রণা আর বেদনা-এত বেশি কেন দিলে বলে গেলে না, ঘুমিয়ে গেছে শহর হয়তো ঘুমিয়ে গেছো তুমি-জেগে আছে চাঁদ রজনী-আর জেগে আছি আমি চাঁদের আলোয়-যায় না মুছা ঐ চোখের পানি, ভালোবাসার মূল্য কত বলোনা তুমি সজনী, তুমি ভুলের প্রাসাদ গড়ে-চলে গেছো অনেক দূরে, কেমন আছো তুমি-সুখি হতো পেরেছো কিনা-জানতে বড় সাধ হয়-আমাকে ভুলেছো কিনা?, ভালোবাসি আমি তোমাকে-তুমি বুঝলে না-হৃদয়ের কথা কখনও তুমি জানলে নাসহ আরও অসংখ্য গান।

গান গাওয়ার সুবাধে কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবর এ পর্যন্ত পৃথিবীর অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ইতালী, কানাডা, জাপান, কোরিয়া, হংকং, মালয়েশিয়া, চীন, অস্ট্রেলিয়া, আবুধাবী, দুবাই, শারজা, কাতার ও বাহরাইনসহ অনেক দেশে। কুমিল্লার কৃতি সন্তান, যাকে নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি সেই আসিফ আকবর এখন সবুজ শ্যামলের দেশ পেরিয়ে দেশের বাইরেও একজন প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী। বাংলাদেশের মিডিয়া অঙ্গনে আসিফ এক অনন্য নাম। তিনি ধীরে ধীরে আরো সাফল্যের পথে এগিয়ে যাবেন বলে আমরা মনে করি।

লেখক:
নির্বাহী সম্পাদক,
সাপ্তাহিক নিরীক্ষণ ও চলচ্চিত্র গবেষক।

খবরটি সংগ্রহ করেনঃ- মোঃ মঈন উদ্দিন
এই খবরটি মোট ( 2517 ) বার পড়া হয়েছে।
add

Share This With Your Friends